স্বামী বিবেকানন্দের বাণী
1/যাঁহার মধ্যে এই ব্রহ্মাণ্ড, যিনি এই ব্রহ্মান্ডে অবস্থিত, আবার যিনিই এই ব্রহ্মাণ্ড; যাঁহার মধ্যে আত্মা, যিনি এই আত্মার মধ্যে অবস্থিত, এবং যিনিই এই মানবাত্মা; তাঁহাকে অতএব এই ব্রহ্মাণ্ডকে আত্মস্বরূপ, জানিলে আমাদের সমস্ত ভয় দূর হইয়া দুঃখের অবসান হয় এবং পরম মুক্তিলাভ হয়। যেখানেই প্রমের প্রসারণ কিংবা ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত সুখ-স্বাচ্ছন্নন্দ্যের উন্নতি দেখা যায়, সেখানেই উহা শাশ্বত সত্যের—‘বহুত্বে একত্বে’র উপলব্ধির, উহার ধারণা ও কার্যকারিত্বের মধ্য দিয়াই প্রকাশিত হইয়াছে। পরাধীনতাই দুঃখ; স্বাধীনতাই সুখ।
অদ্বৈতই একমাত্র মতবাদ, যাহা মানুষকে তাহার স্বাধিকার প্রদান করে, এবং তাহার সমস্ত পরাধীনতা, তৎসংশ্লিষ্ট সকল কুসংস্কার দূর করিয়া আমাদিগকে সর্বপ্রকার দুঃখ সহ্য করিবার ক্ষমতা ও কার্য করিবার সাহস প্রদান করে; পরিশেষে উহাই আমাদিগকে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করিতে সক্ষম করে।
2/যোগী বলেন, মনঃসংযমে ব্যর্থতা হইতেই দুঃখের উৎপত্তি। যোগীর আদর্শ জড়-জগৎ হইতে মুক্তিলাভ। প্রকৃতিকে জয় করাই তাঁহার কর্মের মানদন্ড। যোগী বলেন, সমুদয় শক্তি আত্মায় বিদ্যমান, এবং শরীর ও মন সংযত করিয়া আত্মশক্তি বলে যে-কেহ প্রকৃতিকে জয় করিতে সমর্থ।
দৈহিক কর্মের জন্য যতটা প্রয়োজন, তদতিরিক্ত সামান্য পরিমাণ দৈহিক শক্তির অর্থ—বুদ্ধির অনেকখানি হ্রাস। অত্যধিক কঠোর পরিশ্রম করা উচিত নয়, উহা ক্ষতিকর। কঠোর পরিশ্রম না করিলে দীর্ঘজীবী হইবে। অল্প আহার গ্রহণ কর ও অল্প পরিশ্রম কর। মস্তিষ্কের খাদ্য সংগ্রহ কর।
3/পাঁচশ পুরুষের সাহায্যে ভারতবর্ষ জয় করতে পঞ্চাশ বছর লাগতে পারে কিন্তু পাঁচশো নারীর দ্বারা মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা সম্ভব। হে ভারত, ভুলিও না-তোমার নারী জাতির আদর্শ সীতা,সাবিত্রী,দয়মন্তী।
শ্রীনগর, কাশ্মীর*
১লা অক্টোবার
প্রিয় মার্গো১,
অনেকে অপরের নেতৃত্বে সবচেয়ে ভাল কাজ করতে পারে। সকলেই কিছু নেতা হয়ে জন্মায় না। কিন্তু শ্রেষ্ঠ নেতা তিনিই, যিনি শিশুর মতো অন্যের উপর নেতৃত্ব করেন। শিশুকে আপাততঃ অন্যের উপর নির্ভরশীল বলে মনে হলেও, সে-ই সমগ্র বাড়ির রাজা। অন্ততঃ আমার ধারণা এই যে, এই হল নেতৃত্বের মুল রহস্য।…অনুভব করে সত্য, কিন্তু জন-কয়েকেই মাত্র প্রকাশ করতে পারে। অন্যের প্রতি অন্তরের প্রেম, প্রশংশা ও সাহানুভুতি প্রকাশ করার যে ক্ষমতা, তাই এক জনকে অপরের অপেক্ষা ভাব প্রচারে অধিক সাফল্য দান করে।…
তোমার কাছে কাশ্মীরের বর্ণনা দেবার চেষ্টাও ক’রব না। শুধু এইটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে এই ভূস্বর্গ ছাড়া অন্য কোন দেশ ছেড়ে আসতে আমার কখনও মন খারাপ হয়নি। সম্ভব হলে, রাজাকে রাজী করিয়ে এখানে একটি কেন্দ্র প্রতিষ্টা করিবারও যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। এখানে করিয়া অনেক কিছু করবার আছে-আর উপকরণও এত আশাপ্রদ!…
বড় অসুবিধা এই : আমি দেখতে পাই–অনেকে তাদের প্রায় সবটুকু ভালবাসাই আমাকে অর্পণ করে; কিন্তু প্রতিদানে কোন ব্যক্তিকে আমার তো সবটুকু দেওয়া চলে না; কারণ একদিনেই তা হ’লে সমস্ত কাজ পন্ড হয়ে যাবে। অথচ নিজের গন্ডীর বাইরে দৃষ্টি প্রসারিত নয়- এমন লোকও আছে, যারা এরুপ প্রতিদানই চায়। কর্মের সাফল্যের জন্য যত বেশী সম্বব লোকের উৎসাহপূর্ণ অনুরাগ আমার একান্ত প্রয়োজন; অথচ আমাকে সম্পূর্ণভাবে গন্ডীর বাইরে থাকতে হবে। নতুবা হিংসা ও কলহে সবকিছু ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। নেতা যিনি, তিনি থাকবেন ব্যক্তির গন্ডীর বাইরে। আমার বিশ্বাস তুমি একথা বুঝতে পারছো। আমি একথা বলছি না যে, অপরের শ্রদ্ধাকে তিনি পশুর মতো নিজের কাজে লাগাবেন আর মনে মনে হাসবেন। আমি যা বলতে চাই তা আমার নিজের জীবণেই পরিস্ফুট; আমার ভালবাসা একান্তই আমার আপনার জিনিস, আবার প্রয়োজন হ’লে বুদ্ধদেব যেমন বলতেন “বহুজনহিতায়, বহুজনসুখায়”-তেমনি আমি নিজ হস্তেই আমার হৃদয় কে উৎপাটিত করতে পারি। এ প্রেমে উন্মত্ততা আছে, কিন্তু কোন বন্ধন নেই। প্রেমের প্রভাবে অচেতন জড়বস্ত চেতনে পরিবর্তিত হয়। বস্তুত এই হল আমাদের বেদান্তের সার কথা। একই সদ্বস্ত অঞ্জানীর চক্ষে ‘জড়’ এবং ঞ্জানীর চক্ষে ‘ভগবান’ বলে প্রতিভাত হন এবং জড়ের মধ্যে জে চেতনের ক্রমিক পরিচয় লাভ – তাই হল সভ্যতার ইতিহাস। অঞ্জানীরা নিরাকারকেও সাকাররুপে দেখে , ঞ্জানী সাকারেও নিরাকার এর দর্শণ পান। সুখ -দুঃখ, আনন্দ-নিরান্দের মধ্যে আমরা শুধু এই শিক্ষাই পাচ্ছি । … অতিরিক্ত ভাব প্রবণতা কর্মের পক্ষে অনিষ্টকর। ‘ বজ্রের মতো দৃড় অথচ কুসুমের মতো কোমল – এটিই হচ্ছে সার নীতি ।
চিরস্নেহেশীল সত্যবদ্ধ
বিবেকানন্দ
———–
১ মিস মার্গারেট নোবেল্।


0 comments:
Post a Comment